আমি সেক্যুলার – প্রভু, তুমি কি আমার নও
সামাজিক ও মণ্ডলী-সেবার আগ্রহী হওয়ার পেছনের ঘটনাসমূহ বর্ণনার প্রথমেই প্রভুর পক্ষে কাজ করার জন্য আগ্রহী হওয়ার পথে-পথে দুঃখময় ও কঠিন ধাক্কা লাগার বিষয়ে সেক্যুলার মানুষের সঙ্গে সহভাগিতা করতে চাই – জানাতে চাই স্পিরিচুয়ালিটির ধারক, বাহক ও সোল এজেন্টদের।
প্রথম জীবনেই আমার ছোটমামাকে আমার আইডল ভাবতে শুরু করলাম। বাবার প্রথম জীবনে টাকা-পয়সার যোগান ছিল না। আমার বিধবা ঠাকুরমা কীভাবে যে আমার বাবা ও দুই পিসিমাকে মানুষ করেছেন – সেটি ভাবায় আমাকে। পরবর্তীতে শাশুড়ির ইন্টেনসিভ কেয়ারে বাবা প্রকৌশলি হন, যে কারণে আমার জন্ম ও শিশুকাল মামাবাড়িতে মামা-মাসিদের আদর ও ভালোবাসায় কেটেছে। সেই সময় আমার ছোটমামা ঢাকা শহরের তুখোর ছাত্রনেতা, বিখ্যাত তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের ও ঢাকার মহানগরের ছাত্রলীগের সভাপতি, যুদ্ধফেরত তরুণ মুক্তিযোদ্ধা – সঙ্গে সব সময় ২০/২২ জন অনুসারী, বন্ধু। খোলা জিপ, ২০০ সিসি’র মোটর সাইকেল। পাড়ায়, মহল্লায়, কলেজে ‘টিপু ভাই’। আমার মাথা যা বিগড়ে যাবার, বিগড়ে গেল। ঢাকা শহর কাঁপানো সব মামাদের আদরের ভাগ্নে (যাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে এমপি, মন্ত্রী)। পরবর্তীতে একজন খ্রীষ্টিয়ান হিসেবে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ওয়ার্ড থানার মতো কমিটিতে থেকে হলাম ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। পরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা।
এবার বলি অন্য জীবনের কথা।
মণ্ডলী ও সংঘের সেবক বাবার হাত ধরে ছোটবেলায় প্রতি রবিবারে, বড়দিনে ও পুনরুত্থানের গীর্জায় যাবার অভ্যাসও কালক্রমে নেশায় পরিণত হয়। ধীরে-ধীরে জড়িয়ে পড়ি সান্ডেস্কুল, যুব সমিতিসহ মণ্ডলীর বিভিন্ন দায়িত্বে আর এ জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি যে আমাকে জোরেশোরে জড়িয়ে ধরবে তা বুঝি দীর্ঘদিন পরে।
আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি - সান্ডেস্কুল, যুব সমিতি ও মণ্ডলীর সঙ্গে আমার এই জড়িয়ে-পড়ার বিষয়টি যদি না হতো, তবে আমার জীবন ভিন্নতর হতে পারত। হতে পারত পত্রিকার শিরোনাম, পোস্টারের ছবি বা অন্যান্য অনেক কিছু। বাবার মোটর সাইকেলে তিন ভাইয়ের সদরঘাট ব্যাপ্টিষ্ট চার্চে যাওয়ার নেশাটাই ছিল আমার জীবনে প্রভুকে সেবনের নেশা। কয়্যারের গান, বড়দিনের কীর্তন, নাটক ও ভোজের বাজার-সদাই – ডালপালা হয়ে জড়িয়ে ধরেছে মণ্ডলীর সঙ্গে আমাকে। নিজের জীবনের অঙ্গীকারের কথা আজ বলে ফেললাম – প্রভুর কাছে আমার নালিশটা তুলে ধরার জন্য।
মণ্ডলী ও সমাজের ভালোবাসায় আসক্ত আমি ধীরে-ধীরে মণ্ডলীর সেবার দায়িত্ব পেলাম। ‘নিলাম’ বললাম না এজন্য যে, দেশের সবচেয়ে বড় প্রোটেষ্ট্যান্ট চার্চের সম্পাদক হিসেবে মিরপুরের মানুষ আমার প্রতি যে ভালোবাসা দিয়েছে সকল বিষয়ে, তার জন্য আমার কৃতজ্ঞতা ও আনন্দের শেষ নেই। এই দায়িত্ব পাওয়ার পরে দায়িত্ব পালনের ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি, তার বিনিময়ে শুরু হলো প্রভুর আশীর্বাদ বর্ষণের পালা – সবকিছুই বদলে গেল। হঠাৎ মনে হলো, আমি অভিষেকের বরপুত্র। যেখানেই যাই শুধু আশীর্বাদ আর আশীর্বাদ। ক্রমে-ক্রমে ওয়াইএমসিএ, খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন, ঢাকা ক্রেডিট, বহুমুখী, সংঘ-সম্মিলনী, জাতীয় চার্চ পরিষদ, সবশেষে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। প্রভুর জন্য অল্প সময়, ত্যাগ, দায়িত্ব পালন, কোনো-কোনো ক্ষেত্রে একটু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ, ব্যস – এর বিনিময়ে প্রভুর সীমাহীন আশীর্বাদ। শ্রদ্ধেয় স্যামসন এইচ. চৌধুরীর একটি বাক্য আমার জীবনে সত্যি হলো – ‘প্রভু কারো কাছে ঋণী থাকেন না।’ আর আমি বলি, প্রভুকে ঋণী করা যায় না। শুধুমাত্র সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণই নয়, আমার জীবনের শুরুতেই যে জাতীয় রাজনৈতিক আদর্শের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছি, সেই ক্ষেত্রেও অযাচিত আশীর্বাদ ছিল, রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যখন দেখা হয় বা কথা হয় – যখন বলেন, ‘কেমন আছিস’ – ভালোবাসায়-স্নেহে তুই/তুকার সম্বোধন, মণ্ডলীর নেতারা অনেকেই আনন্দিত হন, গর্বিত হন আমাকে নিয়ে – তখন মনে হয়, আর কী চাইবার আছে এই জাগতিক পৃথিবীতে?
যে বিষয়টি আজ যুবসমাজের কাছে তুলে না ধরলে হয়ত আমার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হবে – তা হচ্ছে মণ্ডলীর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা যদি সবকিছুর পরেও নিয়মিত না থাকত, তবে হয়ত ভয়াবহ হতো আমার জীবন। শুধুমাত্র এই একটি সম্পর্কই আমার জীবনকে প্রভুর জন্য ধরে রেখেছে। মণ্ডলীর সঙ্গে যুবকদের লেগে থাকাটাই আজকে পরিবর্তিত জীবনের পূর্বশর্ত।
যে বিষয়ের অবতারণায় আজকের এত ভ্যানভ্যানানি – বৈচিত্রময় জীবনে সুনাম-দুর্নামকে সঙ্গী করে যখনই প্রভুর কাজে জড়াতে চেয়েছি, ততবারই দুঃখের কয়লায় বারবিকিউ’র বিফের স্টেক বা মুরগির ঝলসানো রানের মতো পুড়ে-যাওয়া কালো রং ধরেছি। অনেকেই বলতে চেয়েছেন বা বলেছেন, তুমি কেন মণ্ডলীতে আসো? যুব সমিতির সভাপতি তুমি কেন হবে? তোমার গানের তালন্ত সেক্যুলার জগতে দাও, মণ্ডলীর কয়্যারে না এলেই ভালো হয়। মণ্ডলীর সম্পাদকের মতো ছোট দায়িত্ব তুমি কেন নেবে? তুমি এমপি, মন্ত্রী হবার সাধনা করো, মণ্ডলীর সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে রাজনীতিতে সময় দাও। সর্বশেষ বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটির নির্বাচনের সময় একজন স্পিরিচুয়াল নেতা বললেন, ‘তোমার বাইবেল সোসাইটিতে আসার দরকার নাই।’ তুমি সেক্যুলার – স্পিরিচুয়াল পৃথিবী আলাদা। তুমি সেক্যুলার, তুমি সেক্যুলার, তুমি সেক্যুলার – প্রতিধ্বনির মতো। চারদিকের ধর্মব্যবসায়ীদের সরব চিৎকারে অতিষ্ঠ হয়ে অভিধান নিয়ে বসলাম। সেক্যুলার শব্দের মানে কী – এটি কোন জঘন্য পাপ ও পাপীর কোনো Biblical Termology কি-না? হাতড়ে-খুঁজে বের করলাম এর বাংলা শব্দার্থ। চরম আনন্দে ও উৎসাহে যে শব্দের অর্থ আবিষ্কার করলাম – তা আমাকে চমকে দিয়ে অনাবিল আনন্দ দিল। জানা হলো আমার এই বিশেষণের বা পরিচয়ের কারণেই তো প্রভু আমাকে খুঁজছেন বা ভালোবাসেন। তোমরা যারা স্পিরিচুয়াল নামধারী – তোমাদের প্রভু খোঁজেন কি? প্রভু তো মানুষ হিসেবে জন্ম না নিয়ে সেক্যুলার না হলেও পারতেন। জলে বাপ্তাইজিত হয়ে স্পিরিচুয়াল হওয়ার দরকার ছিল কেন? সেক্যুলার পৃথিবীর মানুষকেই প্রভুর প্রয়োজন। স্পিরিচুয়ালিটির ধারক-বাহকরা অনেকে আমাদের দেশের পুরাতন রাজনৈতিক দলের মতো। ধর্মীয় নেতারা ভাবেন, মূল স্পিরিচুয়াল লোকেরা থাকলেই হবে – নতুন লোকের আমাদের দরকার কী? আমরা আলাদা। নতুন স্পিরিচুয়ালদের দরকার কী? ওরা তো সেক্যুলার থাকলেই ভালো। পুরাতন নিয়মের মহাপবিত্র যাজকদের মতো বা পুঁজিবাদী নেতাদের শ্রেণিবৈষম্যের মতো। আমি সেক্যুলার, কিন্তু আমি মদ-গাঁজা খাই না। আমি সেক্যুলার, কিন্তু অনেক ধর্মীয় দলের নেতাদের খোলামেলা জীবন-ধারনের ফায়দা কুড়ানোর মতো অনাচারে আমি জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে অনাচারের অপবাদ নেই। আমি সেক্যুলার, কিন্তু ধর্মব্যবসার টাকায় আমার জীবন চলে না। আমি সেক্যুলার, আমার প্রভুকে আমি ডলার কামানোর জন্য হাটে উঠাই না। আমি সেক্যুলার। আমি তাদের খুঁজি, যারা আমাকে স্পিরিচুয়াল করার শপথ নিয়ে প্রভুতে প্রতিজ্ঞা করেছেন। আপনারা কোথায়? আপনারা আমাকে খোঁজেন কি? প্রভু আমাকে পরিবর্তনের কাজে আপনাদের মনোনয়ন দিয়েছেন, যাতে আমি প্রভুতে স্পিরিচুয়াল হই। কিন্তু আপনাদের উৎপাতে প্রভুর কাছে ফিরে আসার বদলে ছুটে পালাতে হয়। একবার ভেবে দেখুন, আমি সেক্যুলার বলে আমার আছে শুধুই ভবিষ্যৎ - সে ভবিষ্যৎ স্পিরিচুয়াল হওয়ার সম্ভাবনা, কিন্তু আপনাদের আছে শুধুই অতীত – ভবিষ্যৎ নেই।
প্রভু, আমি সেক্যুলার, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি। প্রভু, আমি সেক্যুলার, তোমার জন্য কাজ করতে চাই। প্রভু, আমি সেক্যুলার, তোমার বাক্যের ও মণ্ডলীর সেবক হতে চাই। প্রভু, আমি সেক্যুলার, এই বিশেষণের বিশ্লেষণে যেন তোমার জন্য আমার কাজের ও ভালোবাসার ঘাটতি খুঁজে না বেড়াই। কারণ তুমি নিজেই আমার মতো সেক্যুলার মানুষের জন্য মৃত্যু যাতনায় আমাকে মুক্তির শপথ নিয়েছ।

