আশ্চর্য যীশু
- দেখা হয়েছেঃ 226
- 0 টি মন্তব্য
- সাবস্ক্রাইব করুন
আমাদের জীবনে অনেক ভাবেই আমরা 'আশ্চর্য' শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। অনেক সময় ব্যক্তির, ঘটনার, সময়ের, এমনকি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করতে আমরা 'আশ্চর্য' শব্দ ব্যবহার করি। কিন্তু কখনও কি আমরা প্রভু যীশুর ক্ষেত্রে যাকে আমরা আমাদের মুক্তিদাতা হিসাবে জানি ও মানি তাঁর ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছি? এমনকি বিশেষ কিছু তাঁর মধ্যে দেখেছি যে তাঁকে 'আশ্চর্য' বলতে পারি? এখানে তাঁর ক্ষেত্রে কিছু 'আশ্চর্য' বিষয় তুলে ধরছি।
১) যীশু 'আশ্চর্য' ভবিষ্যদ্বাণীতে:
যীশু ছিলেন 'আশ্চর্য' যেভাবে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করেছিলেন। তাঁর জন্মের ৮০০ বছর পূর্বে নবী যিশাইয় তাঁর জন্ম সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাছাড়া আরো অনেকেই ভাববাণী বলেছিলেন যীশুর জীবন ও কাজ সম্বন্ধে।যীশু তাঁর প্রথম আগমন সম্বন্ধে অন্তত ৩০০ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করেছিলেন। তিনি যিহুদা বংশে জন্মগ্রহণ করবেন (আদি ৪৯:১০ পদ) ও যার রাজদণ্ড যাবে না যা ছিল যিশয়ের (যিশয়) বংশ (লূক ৩:২৩ - ৩২ পদ)। তাঁর জন্ম স্থান হবে বৈৎলেহমে (মীখা ৫:২ পদ) সে বিষয়েও বলা হয়েছিল। তাঁর সমস্ত জীবনকাল এবং বিশেষভাবে শেষ দুঃখভোগের বিষয় সমস্ত ভাববাণী (যিশা ৫৩ অধ্যায়) তিনি পূর্ণ করেছিলেন অক্ষরে অক্ষরে। এমনটি সাধারণত আর কারও ক্ষেত্রে হয়নি। যীশুর মত এমন আশ্চর্য মানুষ আর কেউই ছিলেন না এবং ভবিষ্যতে থাকার সম্ভাবনাও নেই। স্বর্গদূত সখরিয়কে বলেছিলেন যোহনের জন্মের বিষয় যিনি হবেন যীশুর অগ্রদূত ও পথ সংস্কারক হিসাবে।
২) যীশু 'আশ্চর্য' তাঁর জন্মে:
যীশু 'আশ্চর্য' ছিলেন তাঁর জন্মে। তিনি ছিলেন স্বর্গীয় বাবার মর্ত্যের মায়ের সন্তান।
ঈশ্বর মনোনীত করেছিলেন রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে আস্তাবল, মখমলের বিছানার পরিবর্তে যাবপাত্র এবং ছোট্ট সুন্দর জামা-কাপড়ের পরিবর্তে সাধারণ ন্যাকড়া। রাজাদের রাজা হয়ে তিনি কোন হোটেলে জায়গা পান নি (লূক ২ঃ৭ পদ)।
ঈশ্বর মাংসে মূর্তিমান হলেন অর্থাৎ মানুষ হয়ে জন্ম নিলেন। অনন্তের ঈশ্বর যীশু নামে মানুষের আকার লাভ করলেন। মাংসের রূপ ধারণ করলেন কারণ তিনি অদৃশ্যকে দৃশ্যে, অনন্ত ঈশ্বরকে মানুষের মনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রকাশ করলেন। পাপময় সমস্ত জগতের মুক্তির মূল্য দান করলেন (যোহন ১: ১৪ পদ)। মহাপুরোহিতের দ্বারা উদ্ধার কাজ সমাপ্ত করলেন। মাংসে ঈশ্বরের প্রকাশ ছিল মহা অসাধারণ কাজ (ইব্রীয় ২: ১৭; ৪:১৪-১৫ পদ)। প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বাইরে এ জন্ম ছিল একটি অতি প্রাকৃতিক কাজ।
৩) যীশু 'আশ্চর্য' তাঁর জীবনে:
মানুষ যে ঈশ্বর হলেন তা নয় বরং ঈশ্বর মানুষ হলেন। যীশু সব সময়ই ঐশ্বরিক প্রকৃতির ছিলেন। মনুষ্যরূপ ধারণে তিনি মানবীয় প্রকৃতিও ধারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে যীশু একশত ভাগ ঈশ্বর এবং একশত ভাগ মানুষ ছিলেন (ইব্রীয় ৫:৭-৮ পদ)। পৃথিবীতে তিনি ক্ষণকাল ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি 'আলফা' এবং 'ওমেগা'; প্রথম ও শেষ; শুরু ও সমাপ্তি (প্রকাশিত ২২: ১৩ পদ)। যীশু ছিলেন 'জীবন খাদ্য' (যোহন ৬: ৩৫ পদ) তথাপি তিনি ক্ষুধার্ত হতেন। তিনি ছিলেন জীবন জল (যোহন ৪:১৪ পদ) তথাপি তিনি তৃষ্ণার্ত হতেন। তিনি অন্যকে সান্ত্বনা দিতেন তথাপি এক সময় ছিল যখন তিনি কেঁদেছিলেন (যোহন ১১:৩৪-৩৫ পদ)। তিনি বৃহৎ জনতার কাছে কথা বললেও গাছের উপরে চড়া ব্যক্তিকে (লূক ১৯:৪ পদ) অথবা কূপের পাশে জল তুলতে আসা সাধারণ নারীকে (যোহন ৪:৬-৭ পদ) অবজ্ঞা করেন নি। তাই তাঁকে বলা হয়েছে 'আশ্চর্য' মন্ত্রী বা পরামর্শদাতা (যিশাইয় ৯: ৬ পদ)। যদিও তিনি নিজে কোন বই লিখেন নি তথাপি পৃথিবীর ছাপাখানাগুলো তাঁর বিষয় লিখে লিখে লাইব্রেরীর পর লাইব্রেরী গড়ে তুলেছে। তিনি কোন কলেজ স্থাপন করেন নি তথাপি পৃথিবীর পণ্ডিতগণ বলেন যে, যীশুর মত কেউ কথা বলেন নি। তিনি গৌরবের মুকুট পরিহার করে কাঁটার মুকুট পড়েছিলেন। তিনি রাজাদের রাজা হলেও রাজারাই তাঁকে মেরেছিল। তিনি অন্যের মরণযাত্রা থামিয়ে দিতেন (লূক ৪:১১-১৫ পদ)। কিন্তু কেউ তাঁর মরণযাত্রা থামাতে পারে নি। যীশু সমগ্র জীবন ধরে আশ্চর্য ছিলেন।
৪) যীশু 'আশ্চর্য' ছিলেন তাঁর মৃত্যুতে:
যীশুর মৃত্যুর ধরন কিরূপ হবে তা পূর্বেই বিস্তারিতভাবে বাইবেলের পুরাতন নিয়মে (নবীদের গ্রন্থে) বলা হয়েছে। তিনি স্ব-ইচ্ছায় মৃত্যুর জন্য জীবন সমর্পণ করেছিলেন (যোহন ১০:১৭-১৮ পদ)। তিনি আমাদের পাপের জন্য মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি নিজেকে আমাদের মুক্তির মূল্যরূপে বলিকৃত (কোরবান) হলেন এবং আমাদেরকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্মিলিত করলেন। তাঁর মৃত্যু ছিল বিনিময়, মুক্তির মূল্য এবং আমাদের আরোগ্যের জন্য। অধার্মিকদের হাতে তিনি মরেছিলেন। প্রকৃতি বিদ্রোহ করেছিল যখন তিনি মারা যাচ্ছিলেন। সূর্য অন্ধকার হয়েছিল, মন্দিরের পর্দা চিরে গিয়েছিল, ভূমিকম্প হয়েছিল, পাথরগুলো ফেটে গেল, কবর খুলে গেল, মৃতেরা পুনরুত্থিত হয়েছিল। যীশু এসেছিলেন স্বর্গীয় সেবা ত্যাগ করে পৃথিবীর জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় মহিমা থেকে পৃথিবীর অপমান বহন করতে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় প্রাচুর্য থেকে পৃথিবীর দৈনতার মধ্যে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় মুকুট ত্যাগ করে পৃথিবীর ক্রুশ গ্রহণ করতে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় মহিমা থেকে পৃথিবীর অপমান বহন করতে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় উন্নত মহিমা থেকে পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় সহভাগিতা থেকে পৃথিবীর বিরোধিতায়। তিনি এসেছিলেন স্বর্গীয় মহিমা থেকে মর্ত্যের ঘৃণায়।
৫) যীশু 'আশ্চর্য' তাঁর পুনরুত্থানে:
পীলাত (দেশাধ্যক্ষ) নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যেন কেউ যীশুর কবরে ঢুকতে বা বের হতে না পারে। তাই তিনি যীশুর কবর সীলগালা করেছিলেন এবং রোমান সৈন্যদের দ্বারা পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। তথাপি তিনি কবর থেকে উঠেছিলেন। তাই তিনি আশ্চর্য ছিলেন তাঁর পুনরুত্থানে কারণ তা ছিল সত্যই তুলনাহীন। যীশু মৃতদের মধ্য থেকে পুনরুত্থিত হয়েছিলেন। যিনি আর কখনও মৃত্যুর জন্য নয়। তাঁর পুনরুত্থান তাঁর ঈশ্বরত্বের প্রমাণ করে। আমাদের ঈশ্বর হচ্ছেন জীবন্ত ঈশ্বর। খ্রীষ্টের পুনরুত্থান (ইস্টার) আমাদের খ্রীষ্টিয় বিশ্বাসের কোণের প্রস্তর হয়ে গেল।
পুনরুত্থান ছাড়া কোন সুখবর হতে পারে না। খ্রীষ্টধর্মের মহান বার্তা হচ্ছে পাপ ও মৃত্যুর উপরে খ্রীষ্টের মহান বিজয় লাভ। যীশু স্বর্গে চলে যাবার পূর্বে বিভিন্ন সময় তাঁর পুনরুত্থিত দেহ নিয়ে অনেককে দেখা দিয়েছিলেন। শাস্ত্রানুসারে যীশু পৃথিবীতে এসেছেন, মৃত্যু বরণ করেছেন, কবর প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তৃতীয় দিনে মৃত্যু থেকে জীবিত হয়েছেন। যে কেহ তাঁতে বিশ্বাস করে, পাপ স্বীকার করে এবং যীশুকে ব্যক্তিগত ত্রাণকর্তা ও প্রভু বলে স্বীকার করে সে অনন্ত জীবন লাভ করে। এটাই আমাদের সংবাদ যা সমগ্র পৃথিবীকে বলতে হবে।
৬) যীশু ছিলেন 'আশ্চর্য' তাঁর বর্তমান কাজে
যীশু শুধুমাত্র প্যালেষ্টাইনে এক সময় ঘটে যাওয়া কোন স্মরণীয় আশ্চর্য ঘটনার কেউ নন। তিনি বলেছিলেন, 'আমার নামে যদি দুই কি তিনজন একত্র হয় তবে আমি তাহাদের মধ্যে আছি'। তাঁর উপস্থিতিতে আমাদের হৃদয় সব সময় উষ্ণ হয়। আমরা হয়তো প্লেনে চড়ে আকাশে উড়তে থাকি, অথবা গাড়ীতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাই অথবা সাধারণ রাস্তায় হাঁটি তথাপি আমরা নিশ্চিত থাকি যে, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি ইম্মানূয়েল, তিনি সব সময় আমাদের সঙ্গে আছেন।
তিনি নিজেকে নত করলেন, মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত বাধ্য থাকলেন। ঈশ্বর তাঁকে উচ্চে উন্নত করলেন এবং সকল নাম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নাম দিলেন যেন সকল জিহ্বা স্বীকার করে যীশু প্রভু (ফিলি ২ঃ৭-১১ পদ)। মানব মুক্তির কাজ শেষ করে তিনি পিতা ঈশ্বরের দক্ষিণ পাশে স্বর্গীয় মহিমায় ঈশ্বরের দক্ষিণ পাশে সিংহাসনে বসে আছেন। ¯^M© ও মর্ত্যের উপরে সমস্ত ক্ষমতা তাঁকে দত্ত হয়েছে (মথি ২৮:১৮ পদ)। তিনি সর্বেসর্বা, তিনি মহা পুরোহিত, তাঁর পুরোহিত্ব কখনও পরিবর্তিত নয়। তিনি সর্বদা আছেন। তিনি নিজের জন্য পক্ষ সমর্থন করেন। তিনি আমাদের পক্ষে পিতা ঈশ্বরের কাছে পক্ষ সমর্থনকারী (উকিল)। তিনি স্থানীয় মণ্ডলীর মস্তক। তাছাড়া বিশ্বজনীন মণ্ডলীর মস্তক হিসাবে পরিচালনা দান করেন।
৭) যীশু 'আশ্চর্য' তাঁর ভবিষ্যৎ কাজে:
যীশুর দ্বিতীয় আগমনের দ্বারা বর্তমানকালের শেষ হবে। যখন তুরীধ্বনী সহ যীশু আসবেন তখন যারা খ্রীষ্টে মরেছে তারা প্রথমে উঠবে এবং চোখের পলকে জীবিতেরা পরিবর্তিত হবে। আমরা এক সঙ্গে আকাশে যীশুর সঙ্গে মিলিত হব। প্রভু তাঁর নিজের লোকদের সংগ্রহ করতে আসবেন পরে জগতের ক্লেশ ভোগ শুরু হবে (১ থিষ ৪:১৩-১৭ পদ)।
খ্রীষ্ট যীশু সহস্র বছর রাজত্ব করতে আসবেন। তাঁর রাজত্বের সময় বিশ্বে শান্তি সমৃদ্ধি থাকবে। সহস্র বছর শেষে শয়তানকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং একটি যুদ্ধে শয়তান পরাজিত হবে এবং খ্রীষ্ট বিজয়ী হবেন, সাধুদের সহিত নতুন যিরূশালেমে থাকবেন। কি আশ্চর্য প্রতিজ্ঞা! কি আশ্চর্য ভবিষ্যৎ!
প্রকৃতপক্ষে যীশু ঈশ্বর থেকে মানবতার জন্য অতি আশ্চর্য দান। 'কারণ ঈশ্বর জগৎকে এমন প্রেম করলেন যে, আপনার এক জাত পুত্রকে দান করলেন, যেন, যে কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে, সে বিনষ্ট না হয়, কিন্তু অনন্ত জীবন পায়' (যোহন ৩: ১৬ পদ)।
যদি আমরা এই দান গ্রহণ করে না থাকি তবে এখনই কি গ্রহণ করতে পারি না? বড়দিন বারে বারে আমাদের স্মরণ করায় ঈশ্বরের এই আশ্চর্য দানের কথা। আশা করি, আমাদের সকলের জন্য এই দান সুন্দর হবে এবং অর্থবহ হবে। তাছাড়া যারা এখনও এই আশ্চর্য দানের বিষয় জানে না তাদের জানাতে যেন ভুলে না যাই।
শুভ বড়দিন



